২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলনের আড়ালে দেশজুড়ে যে নজিরবিহীন সহিংসতা ও পরিকাঠামো ধ্বংসের উন্মত্ততা চালানো হয়েছিল, তা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চিরতরে ধূলিসাৎ করার এক সুপরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্ত। সমালোচকদের মতে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগ ও দাবির অপব্যবহার করে মূলত মার্কিন ‘ডিপ স্টেট’ এর এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং একটি নির্বাচিত সরকারকে বেআইনিভাবে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যেই এই আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল।
এই দেশ ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় দেশের একদল প্রগতিশীল, মূলধারার ও জনপ্রিয় শিল্পী অবচেতনভাবে বা স্বার্থগত কারণে ক্রীড়নকের ভূমিকা পালন করেন।
মার্কিন "ডিপ স্টেট"-এর অর্থায়ন ও সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্ব নির্মাণ
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক টকশোগুলোতে এটি উঠে এসেছে যে, মার্কিন সরকারি ও আধা-সরকারি সংস্থাগুলো (যেমন USAID, NED, DI, IRI) দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশে প্রায় ২৯ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করেছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পও পরবর্তীতে মার্কিন করদাতাদের এই অর্থের রাজনৈতিক অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এই অর্থায়নের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়েছিল সুশীল সমাজ, নির্দিষ্ট কিছু স্বাধীন নির্মাতা, কার্টুনিস্ট ও যুব সংস্কৃতির পেছনে—যা মূলত তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে একটি তীব্র "প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক পরিবেশ" বা ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর মাঠ তৈরি করে। মার্কিন ডিপ স্টেটের এই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ফাঁদে পড়ে এবং পরোক্ষ সুবিধা ভোগ করে দেশের সর্বস্তরের মূলধারার শিল্পীরা আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হন।

ধ্বংসাত্মক আন্দোলনে শিল্পীদের ভূমিকা ও কৌশল
রবীন্দ্র সরোবরের সমাবেশ, ফার্মগেটের মিছিল এবং শহীদ মিনারে একাত্মতা প্রকাশের মাধ্যমে তৈরি হওয়া 'দৃশ্যমান প্রতিবাদী সমাজ' মাঠের উগ্রতাকে একটি "শান্তিপূর্ণ ও নান্দনিক" রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে, যা আন্দোলনকারীদের চূড়ান্ত ভাঙচুরে লিপ্ত হতে মনস্তাত্ত্বিক সাহস জোগায়।
একই সাথে মার্কিন অর্থায়নে পুষ্ট বিভিন্ন থিংক-ট্যাংক ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের তৈরি করা ন্যারেটিভ অনুসরণ করে এই শিল্পীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় 'রেড প্রোফাইল' ক্যাম্পেইন ও নিয়মতান্ত্রিক সরকারবিরোধী প্রচারণা চালান। এছাড়াও ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন প্ল্যাটফর্মগুলোর বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড ও র্যাপার শিল্পীদের উগ্র গান প্রমোট করা হয়, যা তরুণ সমাজকে রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো ও জাতীয় সম্পদে আঘাত করতে সরাসরি প্ররোচিত করেছিল।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় মার্কিন "ডিপ স্টেট"-এর সূক্ষ্ম ভূ-রাজনৈতিক অর্থায়ন ও বৈশ্বিক ন্যারেটিভের ফাঁদে পড়ে সাধারণ সংস্কৃতিকর্মীদের একতাবদ্ধ করতে এবং রাষ্ট্রীয় শাসনতান্ত্রিক পতনের পথ তৈরি করতে বেশ কয়েকজন সুনির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সম্মুখভাগ থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অভিনেতাদের এক কাতারে এনে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর মূল কাজটি করেছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী, ইরেশ যাকের, আশফাক নিপুণ, অমিতাভ রেজা, কামার আহমাদ সাইমন এবং অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন ও জাকিয়া বারী মম, যাঁদের তৈরি করা 'দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ' ফ্রন্টটি পুরো আন্দোলনকে উসকে দিতে মাঠপর্যায়ে বড় ভূমিকা রাখে।

অন্যদিকে, সঙ্গীত ও ব্যান্ড জগতের তারকাদের এক ছাতার নিচে এনে উগ্রতার মনস্তাত্ত্বিক বৈধতা দিতে এবং রবীন্দ্র সরোবরের সংহতি সমাবেশ সফল করতে সম্মুখ নেতৃত্ব দেন মাইলসের হামিন আহমেদ, মনাম আহমেদ, সুরকার প্রিন্স মাহমুদ, সোলসের পার্থ বড়ুয়া এবং ওয়ারফেইজের শেখ মনিবুল হক টিপু। প্রগতিশীল ও গণ-সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের ব্যানারে রাজপথে 'দ্রোহযাত্রা' ও প্রতিবাদী সমাবেশগুলো সংগঠিত করে আন্দোলনকারীদের চাঙ্গা রাখতে মাঠপর্যায়ে সরাসরি নেতৃত্ব দেন গণ-সঙ্গীতশিল্পী ফারজানা ওয়াহিদ শায়ান, অরূপ রাহী এবং কবি ও চারণ শিল্পী কফিল আহমেদ। ডিজিটাল পরিমণ্ডলে 'রেড প্রোফাইল' ক্যাম্পেইনের উসকানিমূলক পোস্টার তৈরি ও স্বাধীন কার্টুনিস্টদের একতাবদ্ধ করার নেপথ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিলেন আলোকচিত্রী শহীদুল আলম, চিত্রশিল্পী দেবাশীষ চক্রবর্তী এবং কার্টুনিস্ট মোর্শেদ মিশু—যাঁদের সম্মিলিত উসকানি ও প্রোপাগান্ডা তৎকালীন সময়ে দেশের কয়েক দশকের কষ্টার্জিত উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো ধ্বংসের প্রক্রিয়াকে চূড়ান্তভাবে ত্বরান্বিত করেছিল।
মার্কিন ডিপ স্টেটের তৈরি করা ন্যারেটিভ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের অংশ হয়ে যারা এই রাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দিতে ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
মেগাস্টার ও ব্যান্ড প্রধানগণ : নগরবাউল জেমস, শাকিব খান (তারা উভয়ে প্রোফাইল পিক লাল করেন)
ব্যান্ডসমূহ ও ব্যান্ড সদস্যবৃন্দ : শিরোনামহীন (জিয়াউর রহমান, শেখ মুনিরুল ইসলাম জিওন), আর্টসেল (কাজী ফয়সাল আহমেদ ও অন্যান্য সদস্য), ওয়ারফেইজ (শেখ মনিবুল হক টিপু, ইব্রাহিম আহমেদ কমল, শেখ রেজওয়ান), মাইলস (মনাম আহমেদ, ফোয়াদ নাসের বাবু), সোলস (পার্থ বড়ুয়া), আর্ক (হাসান), অ্যাভয়েড রাফা (রাফায়াত রশীদ রাফা), সোনার বাংলা সার্কাস (প্রবর রিপন), মেঘদল (শিবু কুমার শিল, মেজবাউর রহমান সুমন, তানভির মজিদ), নেমেসিস (জোহাদ রেজা চৌধুরী), ইন্ডালো (জন কবির), আর্বোভাইরাস (সুফিয়ান ও অন্যান্য সদস্য), ক্রিপ্টিক ফেইট (শাকিব চৌধুরী), পাওয়ারসার্জ (জামশেদ চৌধুরী), ব্ল্যাক (জাহান বি আর ও অন্যান্য সদস্য), চিরকুট (শারমীন সুলতানা সুমী ও সদস্যবৃন্দ), জলের গান (কনক আদিত্য, রাহুল আনন্দ ও সদস্যবৃন্দ), অ্যাশেস (জুনাইদ ইভান), মাকসুদ ও ঢাকা (মাকসুদুল হক), আভাস (তানযীর তুহিন), কুঁড়েঘর (তাসরিফ খান), মেকানিক্স, অড সিগনেচার, কাঁচপোকা, বাংলা ট্র্যাশ ও ইনফার্নাস।
একক কণ্ঠশিল্পী, সুরকার ও সংগীত পরিচালক : র্যাপার হান্নান, প্রিন্স মাহমুদ, তাহসান খান, বিপ্লব (প্রমিথিউস), আসিফ আকবর, বাপ্পা মজুমদার, নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি, অর্ণব, এলিটা করিম, আরমীন মুসা, পান্থ কানাই, জয় শাহরিয়ার, বিথী ঘোষ, কৃষ্ণকলি, একে রাহুল, খৈয়াম সানু সন্ধি, সুজিত মোস্তফা, শওকত আলী ইমন, ঋতু রাজ, শেখ সাদী, টুম্পা খান, হৃদয় খান, কোনাল, সুজন আরিফ, মুহিন, আর্নিক, রাফাত, দোলা।
চলচ্চিত্র ও নাট্য অভিনেতা-অভিনেত্রী : রুকাইয়া জাহান চমক, মামুনুর রশীদ, আজাদ আবুল কালাম, চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম, সিয়াম আহমেদ, আরিফীন শুভ, শরিফুল রাজ, জিয়াউল রোশান, তৌসিফ মাহবুব, ইরেশ যাকের, আব্দুন নূর সজল, জিয়াউল হক পলাশ (কাবিলা), ইয়াশ রোহান, মনোজ প্রামাণিক, খায়রুল বাসার, ফারহান আহমেদ জোভান, শামীম হাসান সরকার, আরশ খান, আজমেরী হক বাঁধন, নুসরাত ইমরোজ তিশা, মেহজাবীন চৌধুরী, নাজিফা তুষি, পরীমনি, জয়া আহসান, নুসরাত ফারিয়া, পুজা চেরি, শবনম বুবলী, সাবিলা নূর, তাসনিয়া ফারিণ, জাকিয়া বারী মম, রুনা খান, তানজিকা আমীন, কাজী নওশাবা, স্পর্শিয়া, হিরো আলম, রিয়া মনি।
চলচ্চিত্র ও নাট্য নির্দেশক : মাবরুর রশীদ বান্নাহ, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, অমিতাভ রেজা চৌধুরী, আশফাক নিপুন, রেদোয়ান রনি, কামার আহমাদ সাইমন, রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত, পিপলু আর খান, খিজির হায়াত খান, মেঝবাউর রহমান সুমন, নাসিফ ফারুক ফাতিন।
দৃশ্যশিল্প, চিত্রশিল্প, কার্টুনিস্ট ও ইনফ্লুয়েন্সার : শহীদুল আলম, দেবাশীষ মুখোপাধ্যায় (চক্রবর্তী), মোর্শেদ মিশু, সৈয়দ রশ্মি, আয়মান সাদিক ও মুনজেরীন (টেন মিনিট স্কুল), রাফসান দ্যা ছোটোভাই, সালমান মুক্তাদির।
গীতিকার ও সংস্কৃতি কর্মী : লতিফুল ইসলাম শিবলী, সোমেশ্বর অলি, আসিফ ইকবাল।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের কয়েক দশকের কষ্টার্জিত উন্নয়ন, মেট্রোরেল ও বিটিভির মতো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের এক কালো অধ্যায়। মার্কিন "ডিপ স্টেট"-এর সূক্ষ্ম ভূ-রাজনৈতিক অর্থায়ন ও এজেন্ডার বলী হয়ে যেসকল শিল্পী নিজেদের সাংস্কৃতিক অবস্থানকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন, ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে তারা বাংলাদেশের পরিকাঠামো ধ্বংসের নেপথ্য অনুঘটক হিসেবেই চিহ্নিত থাকবেন।
লেখক :
সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: