প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি এসএনএ চার্জ দিতে হবে বাংলাদেশকে

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে নতুন চার্জ, বাড়বে ব্যয়

সময় ট্রিবিউন | ২৪ আগষ্ট ২০২৬, ১২:৪৯

ছবি - সংগৃহীত

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির খরচে নতুন করে সেটেলমেন্ট নোডাল এজেন্সি (এসএনএ) চার্জ যুক্ত হতে যাচ্ছে। আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের আওতায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশকে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি হারে এই চার্জ পরিশোধ করতে হবে। পরিমাণে সামান্য হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানির কারণে এর আর্থিক প্রভাব পড়তে পারে।

নতুন এই চার্জ কার্যকর করতে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেড (এনভিভিএন) এবং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর মধ্যে একটি এসএনএ চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মতামত চেয়ে গত ১৮ আগস্ট অর্থ বিভাগে চিঠি দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ

বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, চুক্তি করতে বিলম্ব হলে এনভিভিএনের মাধ্যমে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে আমদানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ রুপি চার্জ

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি রেগুলেটরি কমিশন (সিইআরসি) আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য শুরুতে প্রতি ইউনিটে ০.০১ ভারতীয় রুপি এসএনএ চার্জ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। পরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তা অর্ধেক কমিয়ে ০.০০৫ রুপি নির্ধারণ করা হয়।

ভারত থেকে নেপাল ও ভুটানে আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই হারে এসএনএ চার্জ নেওয়া হচ্ছে।

ভারতের দাবি, আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ে কত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে, তার শিডিউল তৈরি, মিটার থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ, সরবরাহ ও ব্যবহারের হিসাব সমন্বয় এবং গ্রিড পরিচালনাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের ব্যয় মেটাতেই এই চার্জ নেওয়া হবে।

ভারতের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে

বর্তমানে বিভিন্ন চুক্তির আওতায় ভারত থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের।

এর মধ্যে এনভিভিএনের মাধ্যমে সরকারি পর্যায়ে ভারতের এনটিপিসির কেন্দ্র থেকে ২৫০ মেগাওয়াট, দামোদর ভ্যালি করপোরেশন (ডিভিসি) থেকে ৩০০ মেগাওয়াট এবং ত্রিপুরা স্টেট ইলেকট্রিসিটি করপোরেশন থেকে ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে।

এ ছাড়া পিটিসি ইন্ডিয়ার মাধ্যমে বেসরকারি খাতের সেম্বকর্প এনার্জি ইন্ডিয়ার একটি কেন্দ্র থেকে ২০০ মেগাওয়াট এবং সেম্বকর্প থেকে সরাসরি আরও ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে।

সব মিলিয়ে এসব উৎস থেকে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির জন্যই এনভিভিএন ও বিপিডিবির মধ্যে এসএনএ চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর বাইরে ভারতের আদানি পাওয়ারের ঝাড়খণ্ডের গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মধ্যেই এ ধরনের চার্জের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে ওই বিদ্যুতের জন্য আলাদা করে এসএনএ চুক্তির প্রয়োজন হবে না।

বছরে বিদ্যুৎ আমদানিতে ব্যয় ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় শুধু বিদ্যুতের মূল দামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে হুইলিং বা সঞ্চালন চার্জও দিতে হয়। এবার এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে এসএনএ চার্জ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, আদানি পাওয়ার, এনভিভিএন, পিটিসি ইন্ডিয়া ও সেম্বকর্প—এই চার উৎস থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১ হাজার ৬৪১ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ আমদানি করেছে। এ জন্য বিদ্যুতের মূল মূল্য হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৯৯৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে আদানি পাওয়ারের বিদ্যুতের পেছনে। প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে প্রায় ৮০৩ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১১ হাজার ৯৩৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা

এনভিভিএনের বিদ্যুতের জন্য ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৪৫৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা। পিটিসি ইন্ডিয়ার বিদ্যুতের জন্য ১ হাজার ৬৫১ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং সেম্বকর্পের বিদ্যুতের জন্য ১ হাজার ৯৫৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

এর বাইরে এনভিভিএনের বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশকে ২১১ কোটি ৭১ লাখ টাকা হুইলিং চার্জও পরিশোধ করতে হয়েছে। ফলে চার উৎস থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের পেছনে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা

দীর্ঘমেয়াদে বাড়তে পারে আর্থিক চাপ

নতুন এসএনএ চার্জের হার প্রতি ইউনিটে মাত্র ০.০০৫ ভারতীয় রুপি হওয়ায় তা বিদ্যুতের মোট আমদানি ব্যয়ের তুলনায় খুব বড় অঙ্ক নয়। তবে প্রতিবছর শত শত কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ আমদানি করায় দীর্ঘমেয়াদে এই চার্জও উল্লেখযোগ্য ব্যয়ে পরিণত হতে পারে।

বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের সংকট অব্যাহত থাকলে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এসএনএ চার্জ বাবদ বাংলাদেশের ব্যয়ও বাড়বে

বিদ্যুৎ বিভাগের আশঙ্কা, এনভিভিএনের সঙ্গে প্রস্তাবিত এসএনএ চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন না হলে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই বিদ্যুৎ আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


জনপ্রিয় খবর