কথিত কালীমন্দির স্থাপনঃ নেপথ্যে জমি দখলের চেষ্টা

নাজমুস সাকিব মুন, পঞ্চগড় প্রতিনিধি | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৯:০৭

সংগৃহীত সংগৃহীত

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে রাতারাতি কালীমন্দির স্থাপন করে তহশিল অফিসের জায়গা দখলের অভিযোগ উঠেছে মানিক ভুইমালী নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করে ধর্মীয় অনুভূতিকে ঢাল বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে আংশিক তথ্য প্রকাশ করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। মানিক ভুইমালী ওই এলাকার অনিল ভুইমালীর ছেলে। চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার চিলাহাটি ইউনিয়নের ভাউলাগঞ্জ বাজারে।

সরেজমিন ঘটনাস্থল ঘুরে ও প্রাপ্ত নথি থেকে জানা যায়, ভাউলাগঞ্জ মৌজার এক নং খতিয়ানের ৬১৭ নং দাগে .৫২ একর জায়গায় জুড়ে আছে। চিলাহাটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস। বর্তমানে সেখানে নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের দিকে। এর আগে একই জায়গায় টিনের চালা ও কাঠের বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা তিনটি কক্ষে চিলাহাটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম চলমান ছিল। অফিস কক্ষের পাশে একটি জরাজীর্ণ টিন শেড ঘর সাইকেল গ্যারাজ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। স্থানীয়রা বলছেন, ১৯৯০ সালের পূর্বে দুইবার মতান্তরে একবার এই গ্যারাজের স্থানে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে আর কখনোই সেখানে কেউ পূজা আর্চনার আয়োজন বা প্রতিমা স্থাপন করেননি।

খতিয়ানের ছবি

ভূমি অফিস সূত্র জানায়, ২০২০ সালের মে মাসে অফিস কক্ষ ও সাইকেল গ্যারাজটি ঝড়ের কবলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর অস্থায়ী ভাবে চিলাহাটি ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে ভূমি অফিসের কার্যক্রম চালু হয়। একই সাথে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এইদিকে ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর রাতের অন্ধকারে মানিক চন্দ্র ভুইমালী গং গ্যারাজের স্থানে কালীর প্রতিমা ও গ্যারাজের পশ্চিম দিকে শিব লিঙ্গ স্থাপন করে পূজা আর্চনা শুরু করেন এবং জমিটি নিজের পৈতৃক সম্পত্তি বলে দাবি করেন।

পরবর্তীতে বিষয়টি প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হলে চলতি বছরের ০৬ জুন ১৫ দিনের সময় দিয়ে মানিক ভুইমালীকে মন্দির সরিয়ে নেওয়ার নোটিশ প্রদান করা হয়। কিন্তু মানিক ভুইমালী প্রশাসনের নির্দেশনা তোয়াক্কা না করে ৬১৭ দাগের দক্ষিণাংশের ৪২ শতক জমি নিজের দাবি করে জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কথিত কালী মন্দিরে প্রবেশে বাধা প্রদান ও মন্দির উচ্ছেদের বিরুদ্ধে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার ডিক্রী প্রদানের আবেদন জানিয়ে চলতি বছরের আগস্ট মাসের ১ তারিখ আদালতে মামলা করেন।

এইদিকে এসএ ও আরএস খতিয়ান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এসএ খতিয়ানে ৬১৭ দাগ তহশিল অফিস ও আরএস খতিয়ানে হালনাগাদ ২৬২ নং দাগ তহশিল অফিস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত আছে। ফলে মানিক ভুইমালী ৬১৭ নং দাগে যে পৈতৃক সম্পত্তি ও পূর্ব থেকে কালী মন্দির থাকার দাবি করে আসছেন তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

এইদিকে নতুন ভবন নির্মাণের সাথে পুরো ভূমি অফিস এলাকায় সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। গত রবিবার (১১ সেপ্টেম্বর) ভূমি অফিসে প্রবেশের মূল ফটক ভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য পুরনো ফটকের লোহার গেট সরিয়ে ফেলা হয়। পরদিন পুরনো গেটের ফাঁকা স্থানে নতুন করে প্রাচীর নির্মাণ করা হতো। এই সুযোগে রবিবার দিবাগত রাতেই মানিক ভুইমালী ফাঁকা স্থান টিনের বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেন। পরদিন সোমবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকালে ভূমি অফিসের কর্মচারীরা অবৈধ ভাবে দেওয়া টিনের বেড়া খুলতে গেলে মানিক ভুইমালী সেটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে পোস্ট করেন।

ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পুরনো তহশিল অফিস

ভিডিওতে এই সময় মানিককে বলতে শোনা যায় 'আমরা কি পূজা করব না, গেট না রাখলে আমরা কোন দিক দিয়া যাব।' এরপর মানিক ভুইমালীর অবৈধ ভাবে দেওয়া টিনের বেড়া ভূমি অফিসের কর্মচারীরা ভাঙ্গতে শুরু করলে তাকে বলতে শোনা যায়, 'এই যে দেখেন আমাদের কালী মন্দিরের গেট কিভাবে ভাঙ্গি দিতেছে।' অথচ ভিডিওতে আংশিক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। সরেজমিন স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায় বাস্তবে মানিক ভুইমালীর কথার কোন ভিত্তি নেই।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কালী মন্দির ছিল বলে মানিক যে দাবি করছেন তা ভিত্তিহীন। ৬১৭ দাগে ৪২ শতক জমি যদি পৈতৃক সূত্রে মানিক ও তার স্বজনরা পেত তাহলে এতদিন তাদের বাবা-কাকারা কেন জমি দাবি করেনি। ধর্মীয় বিষয়কে পুঁজি করে অবৈধ ভাবে জমি দখলের পাঁয়তারা করছেন মানিক বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

ভাউলাগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা বীপ্রধর রায় বলেন, এর আগে মানিক বলেছিল খতিয়ানে ৬১৭ দাগে তহশিল অফিস দেখাতে পারলে সে মন্দির সরিয়ে নিবে। কিন্তু খতিয়ান দেখানোর পরও সে মন্দির সরিয়ে নিতে টালবাহানা করছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রকৃতপক্ষে ভূমি অফিসের জমির উপর কব্জা করতে তার এই অবস্থান। ধর্মীয়ভাবে আমরা এতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছি।

দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম ফেরদৌস সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মানিক ভুইমালী যে জমির দাবি করছেন কগজপত্রে কোথাও তার প্রমাণ নেই। সীমানা প্রাচীরের ভিতরে মন্দির স্থাপন করায় অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। গত রবিবার দিবাগত রাতে অবৈধ ভাবে ভূমি অফিসের প্রাচীরের ফাঁকা অংশ মানিক টিন দিয়ে ঘিরে দেওয়ায় সোমবার তা ভেঙ্গে ফেলা হয়। এটা কখনই মন্দিরের গেট ছিল না। যে গেটটির কথা বলা হচ্ছে সেটি ভূমি অফিসে প্রবেশের পুরনো গেট ছিল। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় সোমবার ফাঁকা অংশটিতে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে।

ইউএনও আরো বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে যে তথ্য মানিক প্রকাশ করেছেন তা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের হীন চিন্তা মাত্র। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

আদালতে নিষাধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইউএনও গোলাম ফেরদৌস বলেন, মানিক মন্দিরে প্রবেশ বা সরিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আদালতে যে আবেদন করেছিলেন আমরা তার জবাব আদালতে প্রেরণ করেছি। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর আদালত শুনানির দিন ধার্য করেছেন।

বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের দেবীগঞ্জ উপজেলা শাখা ও পঞ্চগড় জেলা জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হরিশ চন্দ্র রায় বলেন, এই বিষয়ে একাধিকবার মানিক ভুইমালীর সাথে আমার কথা হয়েছে। একসময় তিনি বলেছিলেন তহশিল অফিসের সম্পত্তি প্রমাণ করতে পারলে আমি প্রতিমা সরিয়ে নেবো। পরবর্তীতে সকল কাগজ পত্রাদি উপস্থাপন করা হলেও মন্দির সরিয়ে নিতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়া মন্দিরের গেট ভাঙার বিষয়টি সম্পূর্ণ অসত্য। সেখানে ভূমি অফিসের প্রধান গেট সরিয়ে নেয়ায় সীমানা প্রাচীরে সৃষ্ট ফাঁকা অংশ সংস্কার করার আগেই টিনের বেড়া দেয় মানিক ভুইমালী। ভূমি অফিস কর্তৃপক্ষ বাউন্ডারির ঐ ফাঁকা অংশ সংস্কার করতে গিয়েই সেই ভাইরাল ভিডিও'র সৃষ্টি৷ মানিক ভুইমালির এমন আচরণে আমরা বিব্রত।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: