মানসিক স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার

আফিফ আইমান | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ২০:৫০

সংগৃহীত সংগৃহীত

জীবনে কিছু সময় সবারই আসে যখন সবকিছু এলেমেলো মনে হয়। চাপা কষ্ট বাড়তে বাড়তে বুকে পাহাড়ের মতো চেপে বসে। মনে হয় সারা পৃথিবীর ওজন যেন বুকের বাম পাশে কেউ চাপিয়ে দিয়েছে। হৃদপিণ্ড তার স্বভাবগত ছন্দ হারায়,মস্তিষ্ক তার নিয়ন্ত্রণ। আর তখনই মনের অসুখের ঘুনপোকা আমাদের শরীর আর মনে বাসা বাঁধে।মজার বিষয় হলো শরীরের কোনো অসুখের ক্ষেত্রে আমরা দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিলেও মনের অসুখের ক্ষেত্রেই বিষয়টা ঠিক উল্টো। আপনি মনে হয় মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।একথা শুনলেই যেকোনো ব্যক্তির মধ্যে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ দেখা দেয়।কিন্তু বিষয়টি কি তাই হওয়ার কথা ছিল? আমাদেরকে কেউ যদি বলে আপনার শরীরটা দেখে খারাপ মনে হচ্ছে। আপনি একজন ডাক্তার দেখান, তখন কিন্তু আমরা তাকে আমাদের প্রতি সহানূভুতি সম্পন্ন একজন ব্য়ক্তি বলে ধরে নেই। কিন্তু মানসিক ডাক্তার দেখানোর কথা বললে আমরা ধরে নেই আমাদেরকে ওই ব্য়ক্তি সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে।

এভাবে মনের অসুখকে চেপে রাখার নিরন্তন চেষ্টা আমরা চালিয়ে যাই যার ফলে কখনও কখনও তা ভয়ানক আকার ধারণ করে।মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে মা তার নিজের শিশুকে হত্যা করেছে এরকম উদাহরণ আমাদের সমাজে কম নয়।কিন্তু তারপরও পাগল হিসেবে চিহ্নিত হবার ভয় আমাদেরকে বাধ্য করে মনের অসুখের কথা চেপে গিয়ে তথাকথিত সুস্থ্য স্বাভাবিক মানুষের অভিনয় চালিয়ে যেতে। আর এভাবে আমরা নিজেদের সাথে নিজে প্রতারণার আসামী হয়ে যাই।
মানসিক স্বাস্থ্যর বিষয়ে আমাদের উদাসীনতা আমাদের দেশের মধ্যেই এক ধরণের শ্যাডো প্যানডেমিক তৈরি করে চলেছে। একথা হয়ত আমরা অনেকেই জানি না। বর্তমানে আত্মহত্যার মাত্রা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় উদ্বেগজনক ভাবে বেড়েছে।মাহমারীর প্রকোপ, বিশ্বজুড়ে চলা অর্থনৈতিক মন্দা, সাথে সাথে ড্রাগ এর সহজলভ্যতা সব কিছু মিলিয়ে অতিরিক্ত এক চাপ মানব মনের উপর তৈরি করেছে যার মোকাবেলা করা এক কথায় অসম্ভব। একটি সমীক্ষায় দেখা যায়- ২০২১ সালের মার্চ থেকে ফেব্রুয়ারী মাসের মধ্যে আত্মহত্য়ার সংখ্যা ১৪,৪৩৬ জন যেখানে কিনা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্য়া ছিল ৮,৪৬২ জন।
আমাদের আইন ব্যবস্থা অনেকক্ষেত্রে বৃটিশ শাসনের যে দাসত্বের চিহ্ন বহন করে চলেছে তার ছাপ এখনও মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনে খুজে পাওয়া যায়। আমাদের দেশে আজও আত্মহত্যার চেষ্টা একটি অপরাধ। দন্ড বিধির ১৮৬০ এর ৩০৯ ধারা অনুসারে যদি কোন ব্যক্তি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তবে তিনি সর্বোচ্চ ১ বছরের জেল অথবা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।আত্মহত্যার চেষ্টা যদি কোনো ব্যক্তি করে তবে তাকে জেল জরিমানার ভয় দেখিয়ে কি লাভ হবে তা একটি গবেষণার বিষয়। এই আইনটি আমাদের ছোটবেলায় বহুল পঠিত একটি বাগধারা “মরার উপর খাড়ার ঘা” এর আক্ষরিক অর্থ ছাড়া আর কিছুই নয়।নি:সন্দেহে যে মানুষটি আত্মহত্যার চেষ্টা করবে তার নামে মামলা না দিয়ে তাকে জেল না খাটিয়ে কিভাবে তাকে সুস্থ্য স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় সেই চেষ্টা করাই ছিল স্বাভাবিক। মজার বিষয় হচ্ছে যে বৃটিশরা এই আইন প্রণয়ন করেছিল তারা ইতিমধ্যেই তাদের দেশে এই আইনের পরিবর্তন করেছে।এমনকি আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই বিতর্কিত আইনের সংশোধন হয়েছে। ভারতে ২০১৭ সালে,মানসিক স্বাস্থ্য়সেবা আইন ২০১৭ প্রনীত হয় যার ধারা ১১৫ অনুসারে- আত্মহত্যার প্রচেষ্টা কোনো শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয় বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য় তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসা।
সারা পৃথিবীর প্রায় সব দেশ যখন একমত যে আত্মহত্যার চেষ্টাকারী মানুষটির মানসিক সহযোগীতা প্রয়োজন সেখানে এখনও আমরা যেন সেই অন্ধকার যুগে পড়ে আছি। আমাদের দেশে প্রচলিত এই আইনের কারণে আত্মহত্যার চেষ্টাকারী ব্যক্তি তার এই সমস্যার কথা কারো কাছ প্রকাশ করতেও ভয় পায়। একারণে এ ধরণের মানসিকভাবে ভঙ্গুর মানুষদের নূন্যতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে।
বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্য় সেবা আমাদের পরিবারগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য় একান্ত প্রয়োজনীয় হয়ে দাড়িয়েছে।পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে তালাক প্রদান এর পূর্বে কাপল কাউন্সিলিং কে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমাদের দেশে তালাকের হার যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে এধরণের কাউন্সিলিং এর প্রয়োজনীয়তা ছিল। এতে করে অনেক সংসার হয়ত রক্ষা পেত। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নেওয়ার ব্যাপারে সমাজে প্রচলিত ভীতিকর ধারণা বা পাগল হিসেবে চিহ্নিত হবার ভয় থেকে অনেকেই কাউন্সিলর এর কাছে যেতে ভয় পান যেকারণে স্বামী, স্ত্রী আর নাবালক সন্তানদের জীবন হয়ে উঠে অনিশ্চিত।
আমাদের শহর গুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কিছুটা সচেতনার সৃষ্টি হলেও গ্রাম ও মফস্বল শহরে এখনও এ বিষয়ে তেমন কোনো ধারণা গড়ে ওঠেনি।মানসিক বিভিন্ন অসুখ বিশেষ করে সিজোফ্রেনিয়া ও তার প্রাথমিক লক্ষণে দেখা যায় রোগী নানা ধরণের কাল্পনিক চরিত্র দেখে, আওয়াজ শোনে বা অনেক সময় কাল্পনিক চরিত্রের সাথে কথাও বলে।সে মনে করে সব সময় তার সাথে কেউ আছে। এ ধরণের আচরণগুলোকে গ্রামে খুব সহজে জ্বীন বা ভুতে পাওয়া হিসেবে ধরা হয় যা কিনা গ্রাম্য ওঝা বা কবিরাজের সহজ রোজগারের সুযোগ করে দেয়।
ওঝা বা গ্রাম্য কবিরাজদের তথাকথিত চিকিৎসায় মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ার সংখ্যাও কম নয় যদিও বা তার দায়ভার চলে যায় কোনো বদ জ্বীনের উপর। নতুন মায়েদের ক্ষেত্রে যে পোস্ট পারটাম ডিপ্রেশান দেখা যায় সেটিকেও প্রায়শই জ্বীন ভূতের আছর হিসেবে চিহ্নিত করে সহজ সমাধান খুঁজে নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজে একজন প্রফেশানাল কাউন্সিলর থাকার প্রয়োজন ছিল।কিন্তু বেশীর ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই তা নেই। প্রতিটি মানুষের জীবনেই টিনএজ বা তারুণ্যের সময়টা এলোমেলো একটি সময়। মনের আবেগ এসময় প্রবল।সমুদ্রের অপ্রতিরোদ্ধ ঢেউ এর মত সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়। এ সময়ের একটি ভুল সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনের বাকিটা সময় আগোছালো করে দিতে পারে। বিশেষ করে প্রেমঘটিত সমস্যা থেকে জীবন থেকে ছুটি নেওয়ার ইচ্ছা খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়।এসময় একজন অভিজ্ঞ কাউন্সিল বা মনোরোগ চিকিৎসক এর এক ঘন্টার একটা কাউন্সিলিং তার সারা জীবনের গতিপথ পাল্টিয়ে দিতে পারে। মানসিকভাবে প্রায় ভেঙ্গে পড়া মানুষকে তার মনের কথা বলার একটা নিরাপদ জায়গা দিতেও আজকে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা নারাজ। মানুষর মনের দাম অত্যন্ত নগন্য আমাদের এই নগরে তাই মনের অসুখ এখনও আমাদের দেশে কল্পিত ভূতের আছর হয়ে আমাদের কাঁধে চেপে বসেছে।
মনের অসুখের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা পাবার অধিকার সার্বজনীন মানবাধিকার এর একটি অংশ কিন্তু এই স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার অধিকার এখনও আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কোনো মনোচিকিৎসক এর কাছে একঘন্টার কাউন্সিলিং নিতে বর্তমানে ২-৫ হাজার টাকা খরচ করতে হয় যা অনেকেরই সামর্থের বাইরে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গ্রামীন অবকাঠামোয় মানসিক স্বাস্থ্য়সেবা পাবার বিষয়টি ২০২২ সালে এসেও দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। একারণে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাবার অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে।
কাজী মারুফুল আলম
ব্যারিস্টার অ্যাট ল
এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।
খন্ডকালীন শিক্ষক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: