জাবিতে মধ্যরাতে সংবাদকর্মীকে মারধর করল ছাত্রলীগ

জাবি সংবাদদাতা | ৩ আগস্ট ২০২২ ১৫:০৭

সংগৃহীত সংগৃহীত

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) আবাসিক হলের গেস্ট রুমে এক সংবাদকর্মী শিক্ষার্থীকে ডেকে নিয়ে নির্যাতন করার করার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে । শাখা ছাত্রলীগ এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে নিজেরাই নির্যাতনকারীদের নাম জানিয়েছে এবং ঘটনায় জড়িত ৮ ছাত্রলীগ কর্মীকে তাৎক্ষণিক ছাত্রলীগ থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে।

মঙ্গলবার (২ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে এ ঘটনা ঘটে। ভূক্তভোগী সংবাদকর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

ভূক্তভোগী শিক্ষার্থী সময় ট্রিবিউন-কে বলেন, “হল ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী আমাকে জোরপূর্বক হলের গেস্টরুমে ডাকে। আমি অস্বীকৃতি জানালে তারা আমার কক্ষে লোক পাঠিয়ে জোরপূর্বক গেস্টরুমে নিয়ে যায়। সেখানে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। এক পর্যায়ে গেস্টরুমের সিলিংয়ে আমাকে ঝুলতে বাধ্য করা হয়। শারীরিক অসুস্থতার কারণে কিছুক্ষণ ঝুলার পর পড়ে যাই। তখন ছাত্রলীগের কর্মীরা আমাকে মারার জন্য তেড়ে আসে। এরপর ছাত্রলীগ কর্মী আসাদ আসাকে গেস্টরুমে থাকা কফি টেবিলের নিচে মাথা ঢুকিয়ে কান ধরে থাকতে বলে। আমার শারিরীক অসুস্থতার (কোমড়ে ফোড়া) কারণে মাথা ঢুকাতে অপারগতা প্রকাশ করলে তারা আবারও মারমুখি ভঙ্গিতে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে।” 

তিনি বলেন, “আসাদ আমাকে সাংবাদিকতা পেশা ও বিভাগ নিয়ে নানা ধরনের কুরুচিপূর্ণ কথা শোনায় এবং দশ মিনিট লাফাতে বলে। লাফাতে দেরী করলে রুমে অবস্থানরত ২৫-৩০ জন ছাত্রলীগকর্মীর সবাই আমাকে মারতে উদ্যত হয়। তখন আমি লাফাতে শুরু করি এবং এক পর্যায়ে ৫ মিনিটের মতো লাফানোর পর থেমে যাই। তখন তারা আবারও তেড়ে আসলে আমি আবারও লাফাতে শুরু করি। লাফানো থেমে যাওয়ার পর আমাকে মোবাইল বের করতে বলে। আমি মোবাইল দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা মোবাইল কেড়ে নেয়। মোবাইলের লক খুলে দেওয়ার জন্য জোরজবরদস্তি শুরু করে। লক খুলে না দিলে এক পর্যায়ে আসাদ, রায়হান, সেজান, জিয়াদ, রেশাদ, মুনতাসির, মাসুম বিল্লাহ, জাহিদ, ইমরান, শাহাদাৎ, নাফিস ইকবাল আমার শার্টের কলার ধরে এলোপাতাড়িভাবে মারতে শুরু করে। এরপর তারা আমাকে জোরপূর্বক তিন তলায় অবস্থিত আব্দুল্লাহ আল আকাশের (নৃবিজ্ঞান- ৪৪) রুমের দিকে নিয়ে যাওয়া শুরু করে। এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকরা আসলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। কিন্তু তখনও তারা আমার মোবাইল ফেরত দেয়নি। দুই ঘন্টা পর ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আসার দশ মিনিট আগে তারা মোবাইল ফোনটি ফেরত দেয়।”

এ ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আক্তারুজামান সোহেল ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান লিটন ঘটনা পর্যালোচনা শেষে অভিযুক্তদের শাখা ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে স্বীকার করে ৮ জনের নাম ঘোষণা করে এবং অভিযুক্তদের সংগঠন থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।

নির্যাতনকারীরা হলেন, নৃবিজ্ঞান বিভাগের ৪৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আসাদ হক ও একই বিভাগের আরিফ জামান সেজান, ৪৭তম ব্যাচের নৃবিজ্ঞান বিভাগের রায়হান বিন হাবিব, আইন ও বিচার বিভাগের মাসুম বিল্লাহ্, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মুনতাসির আহমেদ তাহরীম, অর্থনীতি বিভাগের জিয়াদ মির্জা, দর্শন বিভাগের মীর হাসিবুল হাসান রেশাদ এবং ৪৮তম ব্যাচের রসায়ন বিভাগের জাহিদ হাসান।

শাখা ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে অভিযুক্ত আসাদ হক, আরিফ জামান সেজান এবং জাহিদ হাসান ঘটনাস্থলে তাদের উপস্থিতির ঘটনা বর্ণনা করেন এবং মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। কিন্তু সিলিংয়ে ঝুলানো এবং মারধর বিষয়টি অস্বীকার করে।

তবে ভুক্তভোগী ওই সংবাদকর্মী শিক্ষার্থীর করা মোবাইল রেকর্ড বিশ্লেষণে ভুক্তভোগীর আনীত অভিযোগগুলোর সত্যতার মিলেছে। যার একটি কপি এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি আক্তারুজ্জামান সোহেল বলেন, “আজ থেকে এই কর্মীরা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকুক তা আমরা চাই না। সাংগঠনিক কাজকর্ম থেকে তারা অবাঞ্ছিত বলে গণ্য হবেন। তারা এই কমিটি থাকা অবস্থায় রাজনীতির সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত থাকবেন না এবং আগামী কমিটিতেও তাদের থাকার কোনো সুযোগ নেই। ছাত্রলীগ পরিচয়ে কেউ এরকম ন্যাক্কারজনক কাজ করলে আমরা সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিব।”

শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান লিটন বলেন, “আমরা আমাদের জায়গায় থেকে সর্বোচ্চ পদক্ষেপের ব্যবস্থা করেছি। সামনের দিনগুলোর জন্য ছাত্রলীগের নাম নিয়ে চলা ছাত্রদের কেউ এরকম ন্যাক্কারজনক কাজ করলে, সংগঠনের পক্ষ থেকে কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”

উক্ত ঘটনায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল প্রশাসনকে বার বার ফোন করা হলেও কেউ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি। 

ওই ঘটনায় আজ বুধবার দুপুরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক আব্দুল্লাহ হেল কাফী বলেন, “আমি গতকাল খুব ক্লান্ত থাকায় ঘুমিয়ে পড়ি ফলে তাদের ফোন রিসিভ করতে পারিনি। আজ সকালে ঘটনা জেনেছি। ঘটনা বিশ্লেষণ করে দ্রুত দোষীদের ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিবো।”

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: